ঢাকা ১১:৪৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ জুলাই ২০২৪, ৮ শ্রাবণ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
শিরোনামঃ
শ্যামনগরে বয়স্ক,প্রতিবন্ধী ভাতার বহি ও জটিল রোগে আক্রান্তদের মাঝে চেক বিতরণ সাতক্ষীরায় থানা ঘেরাওর চেষ্টা কোটা আন্দোলনকারীদের, পুলিশের লাঠিচার্জ স্বাধীনতা বিরোধী স্লোগানের নিন্দা জানিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট বার শ্যামনগর কাশিমাড়ী সুপেয় পানির ট্যাংক বিতরণ বসন্তপুর নদীবন্দর পরিদর্শন করলেন বিআইডব্লিউটি ও ভুমি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বোচ্চ সম্মান দেখাতে হবে : প্রধানমন্ত্রী শ্যামনগরে স্মাট জাতীয় পরিচয়পত্র বিতরণ কার্যক্রম উদ্বোধন নওগাঁর মন্দা বদ্দপুরে তালগাছ চারা রোপন শুভ উদ্বোধন করেন এমপি গামা তালায় দলিত জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন শীর্ষক মতবিনিময় অনুষ্ঠিত দেবহাটায় নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে উঠান বৈঠক

খান আব্দুল গাফফার খান সর্বত্যাগী ফকির, খুব সাধারণ একজন মানুষ হিসেবে রয়ে গিয়েছেন ইতিহাসের পাতায়

  • Sound Of Community
  • পোস্ট করা হয়েছে : ১০:২৫:৩৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৩
  • ২৬৬ জন পড়েছেন ।

খান আব্দুল গাফফার খান নামটা বর্তমানে খুব একটা পরিচিত নাম নয়। ৩১ শে আগস্ট, ১৯৩৪ বোলপুর স্টেশনে দাঁড়িয়ে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সাত সকালে যাত্রীদের কৌতূহল ছিল গুরুদেব কি শান্তিনিকেতন ছেড়ে চলে যাচ্ছেন? কিন্তু তখন কলকাতা যাবার কোনও ট্রেন ছিল না। ট্রেন তো চলে গেলো। তাহলে? জানা গেল, তিনি একজন অতিথিকে রিসিভ করতে এসেছেন।

কে সেই মান্যগণ্য অতিথি! যার জন্যে স্বয়ং গুরুদেব নিজে উপস্থিত স্টেশনে?

বর্ধমানের দিক থেকে একটি ট্রেন এসে বোলপুরে থামল। দেখা গেল রেলগাড়ির একটি তৃতীয় শ্রেনির কামরা থেকে নামছেন এক দীর্ঘদেহী বলিষ্ঠ পাঠান যুবক। তাঁকে দেখা মাত্র রবীন্দ্রনাথ এগিয়ে গেলেন, ৪৪ বছর বয়স্ক যুবক নত হবার চেষ্টা করতেই ৭৩ বছরের কবিগুরু তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।

খান যুবক না হলেও এমন কিছু মধ্যবয়স্ক নন তিনি। কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথের চেয়েও দু বছরের ছোট। সেদিনের ওই মানুষটিই হলেন খান আব্দুল গাফফার খান।

সর্বত্যাগী ফকির, খুব সাধারণ একজন মানুষ হিসেবে রয়ে গিয়েছেন ইতিহাসের পাতায়।

স্বাধীনতা আন্দোলনের সেই দিনগুলিতে ভারতের মানুষ তাঁকে চিনতেন ‘সীমান্ত গান্ধী’ হিসেবে। এই মানুষটি শান্তিনিকেতনের কথা শুনেছিলেন গান্ধিজির কাছে। শুনেছিলেন কবিগুরু বোলপুরের কাছে একটি গ্রামে গরীব মানুষের উন্নয়নের জন্যে একটি সংগঠন ও একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। পেশোয়ার থেকে তাই বড়ো পুত্র আব্দুল গনিকে পাঠিয়েছিলেন শান্তিনিকেতনে লেখাপড়া শিখতে। পুত্রের মাধ্যমে তাঁর সাথে রবীন্দ্রনাথের যোগসূত্র। ১৯৩৪ সালে হাজারিবাগ জেল থেকে মুক্তি পেতেই তিনি বাংলায় আসতে চেয়েছেন। তাঁর আন্তরিক ইচ্ছে কবিগুরুর সাথে একটিবার দেখা করার।

প্রথমে পাটনা গিয়েছিলেন বাবু রাজেন্দ্রপ্রসাদের কাছে। তখন তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামী একজন কংগ্রেস কর্মী। পরবর্তীকালে রাষ্ট্রপতি হয়েছেন। পাটনা থেকে শান্তিনিকেতনে খবর পাঠালেন- খান আবদুল গাফফার খান দেখা করতে চান রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে। তাঁর আগ্রহ শ্রীনিকেতন সম্পর্কেও।

স্টেশন থেকে কবিগুরু তাঁকে প্রথমে নিয়ে এলেন বিশ্বভারতীর লাইব্রেরী প্রাঙ্গণে। সেখানে সমবেত আশ্রমিক, ছাত্রছাত্রী ও অন্যান্যদের সামনে ‘অতিথি’র পরিচয় করিয়ে বললেন, খান সাহেবের শান্তিনিকেতন সফর আশ্রমবাসীদের জীবনে স্মরণীয় ঘটনা। তিনি যখন কারান্তারালে গিয়েছেন, পুত্রকে পাঠিয়েছেন এখানে লেখাপড়া শেখার জন্য। এতেই প্রমাণ মেলে বিশ্বভারতীর প্রতি তাঁর কতখানি আস্থা ও মমত্ববোধ আছে। তাঁর অনুভুতি আমাদের স্পর্শ করেছে।

গাফফার খান একদিনের বেশি শান্তিনিকেতনে থাকতে পারেন নি। একদিনেই তিনি শান্তিনিকেতন-শ্রীনিকেতনের প্রতিটি বিভাগ ঘুরেছেন দেখেছেন, নিজের চোখে। পরের দিন শান্তিনিকেতন ত্যাগের আগে সকালে উদয়ন প্রাঙ্গণে কবি তাঁর সংবর্ধনার আয়োজন করেন। সেখানে বাংলা হরফে লেখা তাঁর ভাষণ কবি উর্দুতে পাঠ করেছিলেন। “থোরেসে অরসেকে লিয়ে অপ হামারে ইঁহা তসরিফ লায়ে হৈ …।”

নিজের হাতে খসড়া করা সেই ভাষণে কবি বলেছিলেন, “অল্পক্ষণের জন্যে আপনি আমাদের মধ্যে এসেছেন। কিন্তু সেই সৌভাগ্যকে আমি অল্প বলে মনে করিনে। আমার নিবেদন এই যে, আমার এ কথাকে আপনি অত্যুক্তি বলে মনে করবেন না যে আপনার দর্শন আমাদের হৃদয়ের মধ্যে নতুন শাক্তি সঞ্চার করেছে। প্রেমের উপদেশ মুখে বলে ফল হয় না, যারা প্রেমিক তাদের সঙ্গই প্রেমের স্পর্শমান। তার স্পর্শে আমাদের অন্তরে যেটুকু ভালবাসা আছে তাঁর মুল্য বেড়ে যায়।
অল্পক্ষণের জন্যে আপনাকে পেয়েছি কিন্তু এই ঘটনাকে ক্ষণের মাপ দিয়ে পরিমাপ কড়া যায় না। যে মহাপুরুষের হৃদয় সকল মানুষের জন্য, সকল দেশেই যাঁদের দেশ তাঁরা যে কালকে উপস্থিত মতো অধিকার করেন, তাঁকে অতিক্রম করেন, তাঁরা সকল কালের। এখানে আপনার ক্ষণিক উপস্থিতি আশ্রমের হৃদয়ে স্থায়ী হয়ে রইলো”।

সংবর্ধনার উত্তরে গাফফার খান সেদিন বলেছিলেন, “গুরুদেব” তাঁকে যে আন্তরিক সংবর্ধনা জানিয়েছেন, তাতে তিনি অভিভুত। এখানে আশার আগে যা শুনেছিলেন, নিজের চোখে দেখে মনে হচ্ছে তাঁর চেয়েও মহৎ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। কবি এখনে যে আদর্শ অনুসরন করেছেন, তাঁর ভিত্তিতে ভারত উন্নতির পথ খুঁজে পাবে। ধর্মের অপবাখ্যার মধ্য দিয়েই সাম্প্রদায়িক মনোভাবের বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়ে, এর জন্যই ভারতের জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষার পূর্ণতায় বাধা আসছে।

গাফফার খান শান্তিনিকেতন থেকে চলে যাবার পর রবীন্দ্রনাথ একটি পত্রে তাঁর সম্পর্কে গান্ধিজিকে লিখেছিলেন- ‘এক অকপট সরলতার’ মানুষ। রবীন্দ্র প্রয়াণের খবর পেয়ে এই মানুষটি পেশোয়ার থেকে কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে জানিয়েছিলেন,

Peshaar 12th Aug. 1941
Dear Mr. Tagore,
I am deeply grieved to hear of the sad demise of Gurudev. In him India has truly lost the greatest philosopher, poet and a nationalist. I heartily condole with you in your sad bereavement. May God bless his soul and give strength in your preasent trial.
Yours sincerely,
Abdul Ghaffar Khan

পঁইত্রিশ বছর পর গাফফার খান আবার শান্তিনিকেতন এসেছিলেন। তখন তাঁর বয়স ৭৯। ক্লান্তিময় বার্ধক্য জাঁকিয়ে বসেছে শরীরে। পাকিস্থান সৃষ্টির ১৭ বছরের মধ্যে ১৫ বছর কেটেছে তাঁর কারাগারে। তিনি ‘হিন্দু ও বিশ্বাসঘাতক’ এই ছিল তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ। অধিকাংশ সময় নির্জন কারাগার, নয়ত নজরবন্দি। ১৯৬৪ সালে স্বেছা নির্বাসন বেছে নিয়েছিলেন আফগানিস্থানের একটি ছোট গ্রাম জালালাবাদে।স্থির করেছিলেন সেখানেই বাকি জীবন কাটাবেন রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধিজির জীবনদর্শন সম্বল করে।

১৯৬৯ সালে গান্ধি জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন কমিটির সভাপতি জয়প্রকাশ নারায়ণ তাঁকে ভারতে আসার আমন্ত্রণ জানান।তিনি সে অনুরোধ অগ্রাহ্য করতে পারেন না। স্বাধীনতা প্রাপ্তির বাইশ বছর পর বিপর্যস্ত স্বপ্ন ও আদর্শ আর ভাঙা মন নিয়ে তিনি ভারতের মাটিতে পা রেখেছিলেন। দিল্লিতে নেহেরু কন্যা প্রিয় ইন্দুকে বলেছিলেন তাঁকে যেন শান্তিনিকেতন যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়।

শান্তিনিকেতন কেন?

মৃদু হেসে উত্তর দিয়েছিলেন, কেন জানো? ১৯৩৪ সালে প্রথম যখন যাই, গুরুদেবের কাছ থেকে স্নেহ ভালবাসা পাবার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার।

১৪ ডিসেম্বর, ১৯৬৯। আগের মতোই রেলের একটি তৃতীয় শ্রেনির কোচ মধ্যরাত্রে বোলপুর স্টেশনে এসেছিল তাঁকে নিয়ে। বাকি রাত সেটি সাইডিং-এ রেখে দেওয়া হয়। গাফফার খান সেখানেই ছিলেন। পরদিন ১৫ ডিসেম্বর সকাল আটটায় তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখার্জি তাঁকে সেখান থেকে নিয়ে যান শান্তিনিকেতনে। তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় উদয়নের সেই ঘরে, যে ঘরে ৩৫ বছর আগে রবীন্দ্রসান্নিধ্যে কেটে ছিল তাঁর একটি দিন।
তারপর তাঁকে বিশ্বভারতীর আম্রকুঞ্জে চিরাচরিত ধারায় সংবর্ধনা দেওয়া হয়।

উত্তরে সেদিনও বলেছিলেন, ৩৫ বছর আগে আমি যখন প্রথম এখানে এসেছিলাম গুরুদেবের যে স্নেহ, ভালবাসা পেয়েছি তা আমার অন্তরে আজও বিরাজমান।

তিনি আশ্রমিকদের হোস্টেল, কলাভবন, বিচিত্রা দেখেন। বিচিত্রায় একটি কাঠ খোদাই মানবমূর্তির সামনে দাঁড়ালে তাঁর চোখ থেকে জল গড়িয়ে নামে। বারবার চোখ কচলে মূর্তিটি পরখ করেন। এ মূর্তি যে গড়েছেন তাঁর পুত্র নন্দলাল শিষ্য আবদুল গনি।

তিনি ঘুরলেন শ্রীনিকেতন। বহু মানুষ উপস্থিত হয়েছিলেন তাঁকে দেখতে। ছোট একটি বক্তৃতাও দেন। ফেরার পথে উপাচার্য কালিদাস ভট্টাচার্যর কাছে সাঁওতাল পল্লী দেখাবার অনুরোধ করলেন।
তাঁকে নিয়ে যাওয়া হোল ভুবনডাঙ্গায়।

সাঁওতালদের সাথে গাফফার খান মিলিত হলেন। জানতে চাইলেন, স্বাধীনতার আগে যেমন আপনাদের দিন কাটত, তাঁর কি কোনও পরিবর্তন হয়েছে? স্বাধীনতা কি আপনাদের জীবনের স্বাদ বদলে দিতে পেরেছে?

দোভাষীর মাধ্যমে তিনি যে জবাব পেয়েছিলেন তাতে তাঁর মুখের হাসি মিলিয়ে গিয়েছিলো। হায় গুরুদেব! হায় স্বাধীনতা!

বুক ভরা আক্ষেপে শুধু এক টুকরো শান্তি ছিল তাঁর শান্তিনিকেতন সফর। ১৯৮৮-র ২০ জানুয়ারি তিনি প্রয়াত হন।
সংগৃহীত।

Tag :
রিপোর্টার সম্পর্কে

Sound Of Community

জনপ্রিয় সংবাদ

শ্যামনগরে বয়স্ক,প্রতিবন্ধী ভাতার বহি ও জটিল রোগে আক্রান্তদের মাঝে চেক বিতরণ

খান আব্দুল গাফফার খান সর্বত্যাগী ফকির, খুব সাধারণ একজন মানুষ হিসেবে রয়ে গিয়েছেন ইতিহাসের পাতায়

পোস্ট করা হয়েছে : ১০:২৫:৩৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৩

খান আব্দুল গাফফার খান নামটা বর্তমানে খুব একটা পরিচিত নাম নয়। ৩১ শে আগস্ট, ১৯৩৪ বোলপুর স্টেশনে দাঁড়িয়ে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সাত সকালে যাত্রীদের কৌতূহল ছিল গুরুদেব কি শান্তিনিকেতন ছেড়ে চলে যাচ্ছেন? কিন্তু তখন কলকাতা যাবার কোনও ট্রেন ছিল না। ট্রেন তো চলে গেলো। তাহলে? জানা গেল, তিনি একজন অতিথিকে রিসিভ করতে এসেছেন।

কে সেই মান্যগণ্য অতিথি! যার জন্যে স্বয়ং গুরুদেব নিজে উপস্থিত স্টেশনে?

বর্ধমানের দিক থেকে একটি ট্রেন এসে বোলপুরে থামল। দেখা গেল রেলগাড়ির একটি তৃতীয় শ্রেনির কামরা থেকে নামছেন এক দীর্ঘদেহী বলিষ্ঠ পাঠান যুবক। তাঁকে দেখা মাত্র রবীন্দ্রনাথ এগিয়ে গেলেন, ৪৪ বছর বয়স্ক যুবক নত হবার চেষ্টা করতেই ৭৩ বছরের কবিগুরু তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।

খান যুবক না হলেও এমন কিছু মধ্যবয়স্ক নন তিনি। কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথের চেয়েও দু বছরের ছোট। সেদিনের ওই মানুষটিই হলেন খান আব্দুল গাফফার খান।

সর্বত্যাগী ফকির, খুব সাধারণ একজন মানুষ হিসেবে রয়ে গিয়েছেন ইতিহাসের পাতায়।

স্বাধীনতা আন্দোলনের সেই দিনগুলিতে ভারতের মানুষ তাঁকে চিনতেন ‘সীমান্ত গান্ধী’ হিসেবে। এই মানুষটি শান্তিনিকেতনের কথা শুনেছিলেন গান্ধিজির কাছে। শুনেছিলেন কবিগুরু বোলপুরের কাছে একটি গ্রামে গরীব মানুষের উন্নয়নের জন্যে একটি সংগঠন ও একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। পেশোয়ার থেকে তাই বড়ো পুত্র আব্দুল গনিকে পাঠিয়েছিলেন শান্তিনিকেতনে লেখাপড়া শিখতে। পুত্রের মাধ্যমে তাঁর সাথে রবীন্দ্রনাথের যোগসূত্র। ১৯৩৪ সালে হাজারিবাগ জেল থেকে মুক্তি পেতেই তিনি বাংলায় আসতে চেয়েছেন। তাঁর আন্তরিক ইচ্ছে কবিগুরুর সাথে একটিবার দেখা করার।

প্রথমে পাটনা গিয়েছিলেন বাবু রাজেন্দ্রপ্রসাদের কাছে। তখন তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামী একজন কংগ্রেস কর্মী। পরবর্তীকালে রাষ্ট্রপতি হয়েছেন। পাটনা থেকে শান্তিনিকেতনে খবর পাঠালেন- খান আবদুল গাফফার খান দেখা করতে চান রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে। তাঁর আগ্রহ শ্রীনিকেতন সম্পর্কেও।

স্টেশন থেকে কবিগুরু তাঁকে প্রথমে নিয়ে এলেন বিশ্বভারতীর লাইব্রেরী প্রাঙ্গণে। সেখানে সমবেত আশ্রমিক, ছাত্রছাত্রী ও অন্যান্যদের সামনে ‘অতিথি’র পরিচয় করিয়ে বললেন, খান সাহেবের শান্তিনিকেতন সফর আশ্রমবাসীদের জীবনে স্মরণীয় ঘটনা। তিনি যখন কারান্তারালে গিয়েছেন, পুত্রকে পাঠিয়েছেন এখানে লেখাপড়া শেখার জন্য। এতেই প্রমাণ মেলে বিশ্বভারতীর প্রতি তাঁর কতখানি আস্থা ও মমত্ববোধ আছে। তাঁর অনুভুতি আমাদের স্পর্শ করেছে।

গাফফার খান একদিনের বেশি শান্তিনিকেতনে থাকতে পারেন নি। একদিনেই তিনি শান্তিনিকেতন-শ্রীনিকেতনের প্রতিটি বিভাগ ঘুরেছেন দেখেছেন, নিজের চোখে। পরের দিন শান্তিনিকেতন ত্যাগের আগে সকালে উদয়ন প্রাঙ্গণে কবি তাঁর সংবর্ধনার আয়োজন করেন। সেখানে বাংলা হরফে লেখা তাঁর ভাষণ কবি উর্দুতে পাঠ করেছিলেন। “থোরেসে অরসেকে লিয়ে অপ হামারে ইঁহা তসরিফ লায়ে হৈ …।”

নিজের হাতে খসড়া করা সেই ভাষণে কবি বলেছিলেন, “অল্পক্ষণের জন্যে আপনি আমাদের মধ্যে এসেছেন। কিন্তু সেই সৌভাগ্যকে আমি অল্প বলে মনে করিনে। আমার নিবেদন এই যে, আমার এ কথাকে আপনি অত্যুক্তি বলে মনে করবেন না যে আপনার দর্শন আমাদের হৃদয়ের মধ্যে নতুন শাক্তি সঞ্চার করেছে। প্রেমের উপদেশ মুখে বলে ফল হয় না, যারা প্রেমিক তাদের সঙ্গই প্রেমের স্পর্শমান। তার স্পর্শে আমাদের অন্তরে যেটুকু ভালবাসা আছে তাঁর মুল্য বেড়ে যায়।
অল্পক্ষণের জন্যে আপনাকে পেয়েছি কিন্তু এই ঘটনাকে ক্ষণের মাপ দিয়ে পরিমাপ কড়া যায় না। যে মহাপুরুষের হৃদয় সকল মানুষের জন্য, সকল দেশেই যাঁদের দেশ তাঁরা যে কালকে উপস্থিত মতো অধিকার করেন, তাঁকে অতিক্রম করেন, তাঁরা সকল কালের। এখানে আপনার ক্ষণিক উপস্থিতি আশ্রমের হৃদয়ে স্থায়ী হয়ে রইলো”।

সংবর্ধনার উত্তরে গাফফার খান সেদিন বলেছিলেন, “গুরুদেব” তাঁকে যে আন্তরিক সংবর্ধনা জানিয়েছেন, তাতে তিনি অভিভুত। এখানে আশার আগে যা শুনেছিলেন, নিজের চোখে দেখে মনে হচ্ছে তাঁর চেয়েও মহৎ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। কবি এখনে যে আদর্শ অনুসরন করেছেন, তাঁর ভিত্তিতে ভারত উন্নতির পথ খুঁজে পাবে। ধর্মের অপবাখ্যার মধ্য দিয়েই সাম্প্রদায়িক মনোভাবের বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়ে, এর জন্যই ভারতের জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষার পূর্ণতায় বাধা আসছে।

গাফফার খান শান্তিনিকেতন থেকে চলে যাবার পর রবীন্দ্রনাথ একটি পত্রে তাঁর সম্পর্কে গান্ধিজিকে লিখেছিলেন- ‘এক অকপট সরলতার’ মানুষ। রবীন্দ্র প্রয়াণের খবর পেয়ে এই মানুষটি পেশোয়ার থেকে কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে জানিয়েছিলেন,

Peshaar 12th Aug. 1941
Dear Mr. Tagore,
I am deeply grieved to hear of the sad demise of Gurudev. In him India has truly lost the greatest philosopher, poet and a nationalist. I heartily condole with you in your sad bereavement. May God bless his soul and give strength in your preasent trial.
Yours sincerely,
Abdul Ghaffar Khan

পঁইত্রিশ বছর পর গাফফার খান আবার শান্তিনিকেতন এসেছিলেন। তখন তাঁর বয়স ৭৯। ক্লান্তিময় বার্ধক্য জাঁকিয়ে বসেছে শরীরে। পাকিস্থান সৃষ্টির ১৭ বছরের মধ্যে ১৫ বছর কেটেছে তাঁর কারাগারে। তিনি ‘হিন্দু ও বিশ্বাসঘাতক’ এই ছিল তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ। অধিকাংশ সময় নির্জন কারাগার, নয়ত নজরবন্দি। ১৯৬৪ সালে স্বেছা নির্বাসন বেছে নিয়েছিলেন আফগানিস্থানের একটি ছোট গ্রাম জালালাবাদে।স্থির করেছিলেন সেখানেই বাকি জীবন কাটাবেন রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধিজির জীবনদর্শন সম্বল করে।

১৯৬৯ সালে গান্ধি জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন কমিটির সভাপতি জয়প্রকাশ নারায়ণ তাঁকে ভারতে আসার আমন্ত্রণ জানান।তিনি সে অনুরোধ অগ্রাহ্য করতে পারেন না। স্বাধীনতা প্রাপ্তির বাইশ বছর পর বিপর্যস্ত স্বপ্ন ও আদর্শ আর ভাঙা মন নিয়ে তিনি ভারতের মাটিতে পা রেখেছিলেন। দিল্লিতে নেহেরু কন্যা প্রিয় ইন্দুকে বলেছিলেন তাঁকে যেন শান্তিনিকেতন যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়।

শান্তিনিকেতন কেন?

মৃদু হেসে উত্তর দিয়েছিলেন, কেন জানো? ১৯৩৪ সালে প্রথম যখন যাই, গুরুদেবের কাছ থেকে স্নেহ ভালবাসা পাবার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার।

১৪ ডিসেম্বর, ১৯৬৯। আগের মতোই রেলের একটি তৃতীয় শ্রেনির কোচ মধ্যরাত্রে বোলপুর স্টেশনে এসেছিল তাঁকে নিয়ে। বাকি রাত সেটি সাইডিং-এ রেখে দেওয়া হয়। গাফফার খান সেখানেই ছিলেন। পরদিন ১৫ ডিসেম্বর সকাল আটটায় তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখার্জি তাঁকে সেখান থেকে নিয়ে যান শান্তিনিকেতনে। তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় উদয়নের সেই ঘরে, যে ঘরে ৩৫ বছর আগে রবীন্দ্রসান্নিধ্যে কেটে ছিল তাঁর একটি দিন।
তারপর তাঁকে বিশ্বভারতীর আম্রকুঞ্জে চিরাচরিত ধারায় সংবর্ধনা দেওয়া হয়।

উত্তরে সেদিনও বলেছিলেন, ৩৫ বছর আগে আমি যখন প্রথম এখানে এসেছিলাম গুরুদেবের যে স্নেহ, ভালবাসা পেয়েছি তা আমার অন্তরে আজও বিরাজমান।

তিনি আশ্রমিকদের হোস্টেল, কলাভবন, বিচিত্রা দেখেন। বিচিত্রায় একটি কাঠ খোদাই মানবমূর্তির সামনে দাঁড়ালে তাঁর চোখ থেকে জল গড়িয়ে নামে। বারবার চোখ কচলে মূর্তিটি পরখ করেন। এ মূর্তি যে গড়েছেন তাঁর পুত্র নন্দলাল শিষ্য আবদুল গনি।

তিনি ঘুরলেন শ্রীনিকেতন। বহু মানুষ উপস্থিত হয়েছিলেন তাঁকে দেখতে। ছোট একটি বক্তৃতাও দেন। ফেরার পথে উপাচার্য কালিদাস ভট্টাচার্যর কাছে সাঁওতাল পল্লী দেখাবার অনুরোধ করলেন।
তাঁকে নিয়ে যাওয়া হোল ভুবনডাঙ্গায়।

সাঁওতালদের সাথে গাফফার খান মিলিত হলেন। জানতে চাইলেন, স্বাধীনতার আগে যেমন আপনাদের দিন কাটত, তাঁর কি কোনও পরিবর্তন হয়েছে? স্বাধীনতা কি আপনাদের জীবনের স্বাদ বদলে দিতে পেরেছে?

দোভাষীর মাধ্যমে তিনি যে জবাব পেয়েছিলেন তাতে তাঁর মুখের হাসি মিলিয়ে গিয়েছিলো। হায় গুরুদেব! হায় স্বাধীনতা!

বুক ভরা আক্ষেপে শুধু এক টুকরো শান্তি ছিল তাঁর শান্তিনিকেতন সফর। ১৯৮৮-র ২০ জানুয়ারি তিনি প্রয়াত হন।
সংগৃহীত।